রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৬:০৪ অপরাহ্ন
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকা ॥
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে এই দায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪.৮০ বিলিয়ন ডলারে, যা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। মূলত বিগত সরকারের নেওয়া উচ্চ ব্যয়ের মেগা প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্রমতে, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে মোট ২৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যার মধ্যে ১৮.৩৮ বিলিয়ন ডলার আসল এবং ৭.৬ বিলিয়ন ডলার সুদ। এই চাপের ধারাবাহিকতায় ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক পরিশোধের পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারে ঠেকতে পারে। এমনকি ২০৩৪-৩৫ সাল নাগাদ এই ঋণের বোঝা ৫২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
রাজস্ব সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা
দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে মাত্র ৮ শতাংশের কাছাকাছি, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ভারতের রাজ্যভেদে এই অনুপাত ১২-১৯ শতাংশ এবং দেউলিয়া দশা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও তা ১২ শতাংশ। এই দুর্বল রাজস্ব কাঠামোর কারণে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে বৈদেশিক ঋণের ওপর অধিক নির্ভর করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজস্ব আদায়ে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে নতুন করে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
মেগা প্রকল্পের ‘ফাঁদ’
অর্থ বিভাগের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত সরকারের আমলে নেওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (১১.৩ বিলিয়ন ডলার), পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল এবং যমুনা রেলওয়ে সেতুর মতো মেগা প্রকল্পগুলো এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় এবং অতিমূল্যায়নকে বর্তমান ঋণের পাহাড়ের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এছাড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে নতুন উৎস তৈরিতে ব্যর্থতা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার পাশাপাশি সরকার যদি ঘাটতি মেটাতে আরও বৈদেশিক ঋণ নেয়, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। আবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।”
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে আসছে বছরের অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে মজুত বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে দেশ যেখানে মোট ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ শোধ করেছে, সেখানে আগামী ৫ বছরেই ২৬ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের বাধ্যবাধকতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক চরম পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।